যোজনী (Valency) বের করার সহজ উপায়

যোজনী (Valency) বের করার সহজ উপায় ও বিস্তারিত গাইড

একজন রসায়ন শিক্ষক হিসেবে আজ আমি আপনাদের সাথে শেয়ার করব কীভাবে খুব সহজেই যেকোনো মৌলের যোজনী নির্ণয় করা যায়।

রসায়নশাস্ত্রে, যোজনী বা Valency একটি মৌলিক ধারণা। কোনো মৌলের যোজনী জানা থাকলে আমরা সহজেই সেই মৌলের রাসায়নিক ধর্ম এবং যৌগ গঠনের ক্ষমতা বুঝতে পারি। এটি রাসায়নিক সংকেত লেখার চাবিকাঠি।

যোজনী বা Valency কাকে বলে?

সহজ কথায়, একটি পরমাণু স্থিতিশীল হওয়ার জন্য অন্য পরমাণুর সাথে যুক্ত হওয়ার সময় যতগুলো ইলেকট্রন বর্জন, গ্রহণ বা শেয়ার করে, সেই সংখ্যাটিই হলো তার যোজনী। অর্থাৎ, কোনো মৌলের যোজনী হলো তার অন্য মৌলের সাথে যুক্ত হওয়ার ক্ষমতা

গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: মৌলের যোজনী এবং জারণ সংখ্যা (Oxidation Number) এক নয়, তবে এদের মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে। যোজনী সর্বদা একটি পূর্ণসংখ্যা হয় এবং এর কোনো ধনাত্মক (+) বা ঋণাত্মক (-) চিহ্ন হয় না।

যোজনী নির্ণয়ের সহজ পদ্ধতিসমূহ

যোজনী বের করার জন্য আমরা ৩টি প্রধান পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারি:

১. ইলেকট্রন বিন্যাসের মাধ্যমে যোজনী নির্ণয় (সবচেয়ে সঠিক পদ্ধতি)

এটি আধুনিক এবং সবচেয়ে বিজ্ঞানসম্মত উপায়। কোনো মৌলের ইলেকট্রন বিন্যাস (Electron Configuration) করার পর তার সর্বশেষ কক্ষপথের ইলেকট্রন সংখ্যা থেকে যোজনী বের করা যায়।

  • ধাতুর ক্ষেত্রে (১-৪ টি ইলেকট্রন): যদি শেষ কক্ষপথে ১ থেকে ৪টি ইলেকট্রন থাকে, তবে সেই সংখ্যাটিই তার যোজনী।
    উদাহরণ: সোডিয়াম (Na) এর শেষ কক্ষপথে ১টি ইলেকট্রন আছে, তাই এর যোজনী ১।
  • অধাতুর ক্ষেত্রে (৪-এর বেশি ইলেকট্রন): যদি শেষ কক্ষপথে ৪-এর বেশি ইলেকট্রন থাকে, তবে ৮ থেকে সেই সংখ্যা বিয়োগ করলে যোজনী পাওয়া যায়। (সূত্র: ৮ - শেষ কক্ষপথের ইলেকট্রন)।
    উদাহরণ: ক্লোরিন (Cl) এর শেষে ৭টি ইলেকট্রন। যোজনী = ৮ - ৭ = ১।
  • নিষ্ক্রিয় গ্যাস: শেষ কক্ষপথে ৮টি (হিলিয়ামে ২টি) ইলেকট্রন থাকায় এদের যোজনী ০।

২. হাইড্রোজেন বা ক্লোরিন পরমাণুর সংখ্যা দ্বারা

কোনো মৌল কতটি হাইড্রোজেন (H) বা ক্লোরিন (Cl) পরমাণুর সাথে যুক্ত হচ্ছে, সেই সংখ্যাটিই তার যোজনী।</

  • HCl: এখানে ১টি ক্লোরিন ১টি হাইড্রোজেনের সাথে যুক্ত, তাই Cl এর যোজনী ১।
  • H₂O (পানি): এখানে অক্সিজেন ২টি হাইড্রোজেনের সাথে যুক্ত, তাই O এর যোজনী ২।
  • NH₃ (অ্যামোনিয়া): এখানে নাইট্রোজেন ৩টি হাইড্রোজেনের সাথে যুক্ত, তাই N এর যোজনী ৩।
  • CH₄ (মিথেন): এখানে কার্বন ৪টি হাইড্রোজেনের সাথে যুক্ত, তাই C এর যোজনী ৪।

৩. পর্যায় সারণীর গ্রুপ সংখ্যা থেকে (সহজ চার্ট)

পর্যায় সারণী (Periodic Table)-এর গ্রুপ সংখ্যা মনে রাখলে যোজনী বের করা খুব সহজ হয়ে যায়।

বিভিন্ন গ্রুপের মৌলসমূহের সাধারণ যোজনী চার্ট
গ্রুপ নং মৌলের ধরন শেষ কক্ষপথে ইলেকট্রন সাধারণ যোজনী উদাহরণ
গ্রুপ ১ ক্ষার ধাতু ১ টি Li, Na, K
গ্রুপ ২ মৃৎক্ষার ধাতু ২ টি Mg, Ca
গ্রুপ ১৩ বোরন পরিবার ৩ টি Al, B
গ্রুপ ১৪ কার্বন পরিবার ৪ টি C, Si
গ্রুপ ১৫ নাইট্রোজেন পরিবার ৫ টি ৩, ৫ N, P
গ্রুপ ১৬ অক্সিজেন পরিবার ৬ টি O, S
গ্রুপ ১৭ হ্যালোজেন ৭ টি F, Cl, Br
গ্রুপ ১৮ নিষ্ক্রিয় গ্যাস ৮ টি Ne, Ar

বিশেষ দ্রষ্টব্য: পরিবর্তনশীল যোজনী (Variable Valency)

কিছু কিছু মৌল একাধিক যোজনী প্রদর্শন করে। এদেরকে পরিবর্তনশীল যোজনী বলা হয়। সাধারণত অবস্থান্তর মৌল (Transition Elements) এই ধর্ম প্রদর্শন করে।

  • আয়রন (Fe): যোজনী ২ (ফেরাস) এবং ৩ (ফেরিক)।
  • কপার (Cu): যোজনী ১ (কিউপ্রাস) এবং ২ (কিউপ্রিক)।
  • সালফার (S): যোজনী ২, ৪ এবং ৬ হতে পারে।

যৌগমূলক বা Radicals-এর যোজনী

যৌগমূলকের যোজনী তাদের আধান বা চার্জের সমান হয়।

  • সালফেট (SO₄²⁻) এর চার্জ -২, তাই যোজনী ২।
  • অ্যামোনিয়াম (NH₄⁺) এর চার্জ +১, তাই যোজনী ১।

আশা করি, এই আলোচনা থেকে আপনি যোজনী বা Valency নির্ণয়ের বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বুঝতে পেরেছেন। নিয়মিত ইলেকট্রন বিন্যাস চর্চা করলে এটি আপনার কাছে আরও সহজ হয়ে উঠবে।