ক্রিয়াপদ কাকে বলে? প্রকারভেদ, উদাহরণ ও সহজে চেনার কৌশল
বাংলা ব্যাকরণে ক্রিয়াপদ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমরা প্রতিদিন কথা বলার সময় অসংখ্য ক্রিয়াপদ ব্যবহার করি, কিন্তু সেগুলো যে ক্রিয়াপদ—তা অনেক সময় আলাদা করে খেয়াল করি না। যেমন—আমি স্কুলে যাই, সে বই পড়ে, পাখি আকাশে উড়ে, মা রান্না করেন। এসব বাক্যে কোনো কাজ বা ঘটনা প্রকাশ করছে এমন শব্দগুলোই ক্রিয়াপদ।
শিক্ষার্থীদের কাছে ক্রিয়াপদ বিষয়টি প্রথমে একটু কঠিন মনে হতে পারে। বিশেষ করে সমাপিকা, অসমাপিকা, সকর্মক, অকর্মক ও দ্বিকর্মক ক্রিয়া আলাদা করার সময় অনেকেই বিভ্রান্ত হয়। তাই এই লেখায় ক্রিয়াপদ কী, কীভাবে চিনতে হয় এবং এর বিভিন্ন প্রকার উদাহরণসহ সহজভাবে আলোচনা করা হলো।
ক্রিয়াপদ কাকে বলে?
যে পদ দ্বারা কোনো কাজ করা, হওয়া, থাকা বা কোনো ঘটনা সংঘটিত হওয়া বোঝায়, তাকে ক্রিয়াপদ বলে।
সহজ ভাষায়, বাক্যে কী করছে, কী করল, কী করবে, কী হচ্ছে বা কী হয়েছে—এ ধরনের প্রশ্নের উত্তর যে পদ দেয়, সেটিই সাধারণত ক্রিয়াপদ।
উদাহরণ
আমি বই পড়ি।
রাহিম মাঠে খেলে।
পাখি আকাশে উড়ে।
বাবা অফিসে গেছেন।
আজ বৃষ্টি হচ্ছে।
এখানে ‘পড়ি’, ‘খেলে’, ‘উড়ে’, ‘গেছেন’ ও ‘হচ্ছে’—সবগুলোই ক্রিয়াপদ।
ক্রিয়াপদ চেনার সহজ কৌশল
ক্রিয়াপদ শনাক্ত করার সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি হলো বাক্য পড়ে প্রশ্ন করা—
যেমন—
“মিতা গল্পের বই পড়ছে।”
প্রশ্ন: মিতা কী করছে?
উত্তর: পড়ছে।
তাই ‘পড়ছে’ হলো ক্রিয়াপদ।
আবার—
“ছেলেটি মাঠে দৌড়াল।”
প্রশ্ন: ছেলেটি কী করল?
উত্তর: দৌড়াল।
তাই ‘দৌড়াল’ ক্রিয়াপদ।
এই পদ্ধতিতে শুধু মুখস্থ না করে বাক্যের ভেতর থেকেই ক্রিয়াপদ খুঁজে বের করা যায়।
ক্রিয়াপদের প্রকারভেদ
ক্রিয়াপদকে বিভিন্ন দিক থেকে ভাগ করা যায়। সাধারণভাবে সমাপিকা ও অসমাপিকা, সকর্মক ও অকর্মক, দ্বিকর্মক, এবং গঠন অনুসারে মৌলিক, যৌগিক ও প্রযোজক ক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করা হয়।
১. সমাপিকা ক্রিয়া কাকে বলে?
যে ক্রিয়াপদ বাক্যের ভাব বা অর্থ সম্পূর্ণ করে, তাকে সমাপিকা ক্রিয়া বলে।
উদাহরণ
“আমি প্রতিদিন স্কুলে যাই।”
এখানে ‘যাই’ বলার পর বাক্যের অর্থ সম্পূর্ণ হয়েছে। তাই ‘যাই’ হলো সমাপিকা ক্রিয়া।
আরও উদাহরণ:
পাখি আকাশে উড়ে।
সে গতকাল বাড়িতে এসেছিল।
আমরা আগামীকাল ঢাকায় যাব।
রিমা চিঠি লিখেছে।
প্রতিটি বাক্যে ক্রিয়াটি বক্তব্যকে সম্পূর্ণ করেছে।
সহজে মনে রাখুন
যে ক্রিয়া বাক্যের ভাব শেষ করে = সমাপিকা ক্রিয়া।
২. অসমাপিকা ক্রিয়া কাকে বলে?
যে ক্রিয়াপদ একা বাক্যের সম্পূর্ণ ভাব প্রকাশ করতে পারে না এবং অর্থ সম্পূর্ণ করার জন্য অন্য একটি ক্রিয়ার প্রয়োজন হয়, তাকে অসমাপিকা ক্রিয়া বলে।
যেমন—
“বাড়িতে গিয়ে...”
এখানে ‘গিয়ে’ বলার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে—বাড়িতে গিয়ে কী করল?
যখন বলা হয়—
“বাড়িতে গিয়ে আমি বই পড়লাম।”
এখানে ‘গিয়ে’ অসমাপিকা ক্রিয়া এবং ‘পড়লাম’ সমাপিকা ক্রিয়া।
আরও উদাহরণ
ভালোভাবে পড়ে পরীক্ষায় ভালো ফল করো।
স্কুলে গিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করলাম।
কাজটি করে সে বাড়ি ফিরল।
বৃষ্টি হলে আমরা বাইরে যাব না।
এখানে ‘পড়ে’, ‘গিয়ে’, ‘করে’ ও ‘হলে’ অসমাপিকা ক্রিয়া।
মনে রাখার কৌশল
যে ক্রিয়া একা বাক্যের ভাব শেষ করতে পারে না = অসমাপিকা ক্রিয়া।
৩. অকর্মক ক্রিয়া কাকে বলে?
যে ক্রিয়ার কোনো কর্ম থাকে না, তাকে অকর্মক ক্রিয়া বলে।
যেমন—
“শিশুটি কাঁদছে।”
শিশুটি কী করছে?—কাঁদছে।
কিন্তু ‘কাঁদছে’ ক্রিয়ার কোনো কর্ম নেই। তাই এটি অকর্মক ক্রিয়া।
উদাহরণ
পাখি উড়ছে।
শিশুটি কাঁদছে।
লোকটি হাঁটছে।
সূর্য উঠেছে।
ছেলেটি হাসছে।
অকর্মক ক্রিয়া চেনার কৌশল
ক্রিয়াকে ‘কী’ বা ‘কাকে’ দিয়ে প্রশ্ন করার পর যদি কোনো কর্ম পাওয়া না যায়, তাহলে সেটি সাধারণত অকর্মক ক্রিয়া।
৪. সকর্মক ক্রিয়া কাকে বলে?
যে ক্রিয়ার সঙ্গে একটি কর্ম যুক্ত থাকে, তাকে সকর্মক ক্রিয়া বলে।
উদাহরণ:
“আমি বই পড়ি।”
প্রশ্ন করি—আমি কী পড়ি?
উত্তর: বই।
এখানে ‘বই’ হলো কর্ম এবং ‘পড়ি’ হলো সকর্মক ক্রিয়া।
আরও উদাহরণ
মা ভাত রান্না করেন।
রাহিম চিঠি লেখে।
মিতা গান গায়।
কৃষক ধান কাটে।
সে গল্প পড়ে।
এখানে ‘ভাত’, ‘চিঠি’, ‘গান’, ‘ধান’ ও ‘গল্প’—ক্রিয়ার কর্ম।
৫. দ্বিকর্মক ক্রিয়া কাকে বলে?
যে ক্রিয়ার সঙ্গে দুটি কর্ম যুক্ত থাকে, তাকে দ্বিকর্মক ক্রিয়া বলে।
উদাহরণ:
“মা শিশুকে দুধ খাওয়ালেন।”
এখানে ‘শিশুকে’ এবং ‘দুধ’—দুটি কর্ম রয়েছে। তাই ‘খাওয়ালেন’ দ্বিকর্মক ক্রিয়া।
আরেকটি উদাহরণ—
“শিক্ষক ছাত্রকে অঙ্ক করান।”
এখানে ‘ছাত্রকে’ এবং ‘অঙ্ক’—দুটি কর্ম রয়েছে।
সহজ কৌশল
একটি ক্রিয়ার সঙ্গে যদি দুটি কর্মের সম্পর্ক পাওয়া যায়, তাহলে সেটি দ্বিকর্মক ক্রিয়া হতে পারে।
৬. মৌলিক ক্রিয়া
যে ক্রিয়াপদ মূল ধাতু থেকে সরাসরি গঠিত হয়, তাকে মৌলিক ক্রিয়া বলা হয়।
যেমন—
খায়
যায়
বসে
হাসে
পড়ে
উদাহরণ:
“সে ভাত খায়।”
এখানে ‘খায়’ মৌলিক ক্রিয়া।
৭. যৌগিক ক্রিয়া
দুই বা ততোধিক ক্রিয়ার অংশ একত্র হয়ে যখন একটি বিশেষ অর্থ প্রকাশ করে, তখন তাকে যৌগিক ক্রিয়া বলা হয়।
যেমন—
করে ফেলেছে
দেখে নিল
নিয়ে এল
বসে আছে
গিয়ে পড়ল
উদাহরণ:
“সে কাজটি করে ফেলেছে।”
এখানে ‘করে ফেলেছে’ একসঙ্গে একটি বিশেষ অর্থ প্রকাশ করছে।
৮. প্রযোজক ক্রিয়া
কর্তা নিজে কাজ না করে অন্য কাউকে দিয়ে কাজ করালে যে ক্রিয়া ব্যবহৃত হয়, তাকে প্রযোজক বা ণিজন্ত ক্রিয়া বলা হয়।
যেমন—
“শিক্ষক ছাত্রদের পড়ান।”
এখানে শিক্ষক ছাত্রদের পড়ার কাজ করাচ্ছেন।
আরও উদাহরণ:
মা শিশুকে খাওয়ালেন।
বাবা ছেলেকে পড়ালেন।
শিক্ষক ছাত্রকে অঙ্ক করালেন।
এখানে অন্যের মাধ্যমে কাজ করানোর ভাব প্রকাশ পাচ্ছে।
ধাতু ও ক্রিয়াপদের সম্পর্ক
ক্রিয়াপদ বুঝতে গেলে ধাতু সম্পর্কে সামান্য ধারণা থাকা দরকার।
ধাতু হলো ক্রিয়ার মূল অংশ। ধাতুর সঙ্গে প্রয়োজনীয় বিভক্তি বা রূপ পরিবর্তনের মাধ্যমে ক্রিয়াপদ তৈরি হয়।
যেমন—
খা + ই = খাই
কর + ই = করি
পড়্ + এ = পড়ে
আবার ব্যক্তি পরিবর্তনের সঙ্গে ক্রিয়ার রূপও পরিবর্তিত হতে পারে।
যেমন—
আমি পড়ি।
তুমি পড়ো।
সে পড়ে।
মূল কাজ একই—পড়া। কিন্তু কর্তা পরিবর্তনের কারণে ক্রিয়ার রূপও পরিবর্তিত হয়েছে।
ক্রিয়াপদ দিয়ে কাল বোঝা যায়
ক্রিয়াপদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, এর মাধ্যমে অনেক সময় কাজটি কখন ঘটছে তা বোঝা যায়।
বর্তমান
“আমি স্কুলে যাই।”
এখানে ‘যাই’ বর্তমান সময়ের কাজ বোঝাচ্ছে।
অতীত
“আমি স্কুলে গিয়েছিলাম।”
এখানে ‘গিয়েছিলাম’ অতীতের ঘটনা বোঝাচ্ছে।
ভবিষ্যৎ
“আমি আগামীকাল স্কুলে যাব।”
এখানে ‘যাব’ ভবিষ্যতের কাজ বোঝাচ্ছে।
অর্থাৎ ক্রিয়ার পরিবর্তিত রূপ থেকে কাজের সময় সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যায়।
ক্রিয়াপদ চেনার কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ
| বাক্য | ক্রিয়াপদ | ধরন |
|---|---|---|
| আমি বই পড়ি। | পড়ি | সকর্মক |
| পাখি উড়ে। | উড়ে | অকর্মক |
| সে স্কুলে গেল। | গেল | সমাপিকা |
| স্কুলে গিয়ে পড়লাম। | গিয়ে | অসমাপিকা |
| মা শিশুকে দুধ খাওয়ালেন। | খাওয়ালেন | দ্বিকর্মক/প্রযোজক |
| সে কাজটি করে ফেলেছে। | করে ফেলেছে | যৌগিক |
| শিক্ষক ছাত্রকে পড়ান। | পড়ান | প্রযোজক |
ক্রিয়াপদ নিয়ে শিক্ষার্থীদের সাধারণ ভুল
ক্রিয়াপদ নির্ণয়ের সময় শিক্ষার্থীরা কয়েকটি ভুল বেশি করে। এর মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ ভুল হলো শুধু বাক্যে কোনো ব্যক্তি বা বস্তু দেখেই সেটিকে কর্ম ধরে নেওয়া।
উদাহরণ—
“সে ঢাকায় যায়।”
এখানে ‘ঢাকায়’ শব্দটি দেখে কেউ কেউ এটিকে কর্ম মনে করতে পারে। কিন্তু ‘ঢাকায়’ এখানে স্থান বোঝাচ্ছে, কর্ম নয়।
তাই কোনো ক্রিয়া সকর্মক না অকর্মক নির্ণয় করার সময় শুধু বাক্যে অন্য কোনো শব্দ আছে কি না তা দেখলেই হবে না; ক্রিয়া ও সংশ্লিষ্ট পদের মধ্যে সম্পর্ক বুঝতে হবে।
ক্রিয়াপদ মনে রাখার সহজ সূত্র
পরীক্ষার আগে দ্রুত মনে রাখার জন্য নিচের সূত্রটি অনুসরণ করতে পারো—
সমাপিকা → বাক্যের ভাব শেষ করে
অসমাপিকা → বাক্যের ভাব শেষ করে না
সকর্মক → কর্ম থাকে
অকর্মক → কর্ম থাকে না
দ্বিকর্মক → দুটি কর্ম থাকে
প্রযোজক → অন্যকে দিয়ে কাজ করানো হয়
যৌগিক → একাধিক অংশ মিলে বিশেষ ক্রিয়ার অর্থ দেয়
পরীক্ষায় ক্রিয়াপদ থেকে কী ধরনের প্রশ্ন আসে?
বাংলা ব্যাকরণে ক্রিয়াপদ থেকে বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন হতে পারে। যেমন—
ক্রিয়াপদ কাকে বলে?
ক্রিয়াপদের উদাহরণ দাও।
সমাপিকা ও অসমাপিকা ক্রিয়ার পার্থক্য লেখ।
সকর্মক ও অকর্মক ক্রিয়া চিহ্নিত কর।
বাক্য থেকে ক্রিয়াপদ নির্ণয় কর।
দ্বিকর্মক ক্রিয়ার উদাহরণ দাও।
প্রযোজক ক্রিয়া কাকে বলে?
যৌগিক ক্রিয়ার উদাহরণ দাও।
ধাতু ও ক্রিয়াপদের সম্পর্ক ব্যাখ্যা কর।
এসব প্রশ্নের উত্তর ভালোভাবে দিতে হলে শুধু সংজ্ঞা মুখস্থ না করে উদাহরণসহ ধারণাটি বুঝে রাখা বেশি জরুরি।
ক্রিয়াপদ: এক নজরে
| বিষয় | সহজ অর্থ |
|---|---|
| ক্রিয়াপদ | কাজ, হওয়া, থাকা বা ঘটনা প্রকাশ করে |
| সমাপিকা | বাক্যের ভাব সম্পূর্ণ করে |
| অসমাপিকা | একা বাক্যের ভাব সম্পূর্ণ করে না |
| সকর্মক | কর্ম থাকে |
| অকর্মক | কর্ম থাকে না |
| দ্বিকর্মক | দুটি কর্ম থাকে |
| যৌগিক | একাধিক অংশ মিলে ক্রিয়ার বিশেষ অর্থ প্রকাশ করে |
| প্রযোজক | অন্যকে দিয়ে কাজ করানো হয় |
উপসংহার
বাংলা ব্যাকরণের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে ক্রিয়াপদ অন্যতম। ক্রিয়াপদ ছাড়া বাক্যের কাজ, ঘটনা বা অবস্থাকে সঠিকভাবে প্রকাশ করা কঠিন। তাই শুধু ‘ক্রিয়াপদ কাকে বলে’—এই সংজ্ঞাটি মুখস্থ করলেই হবে না; বাক্যে ক্রিয়াপদ কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে সেটিও বুঝতে হবে।
ক্রিয়াপদ শেখার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো নিজের পরিচিত বাক্য দিয়ে অনুশীলন করা। যেমন—আমি খাই, আমি পড়ি, আমি স্কুলে যাই, আমি গল্প লিখি। প্রতিটি বাক্যে কাজটি কোন শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে তা খুঁজে বের করলেই ক্রিয়াপদের ধারণা ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে যাবে।
সবশেষে একটি বিষয় মনে রাখুন—
বাক্যে কী করা হচ্ছে, কী হয়েছে, কী হচ্ছে বা কী হবে—এই কাজ বা ঘটনার প্রকাশ যেখানে, সেখানেই ক্রিয়াপদের ভূমিকা রয়েছে।