রাদারফোর্ডের পরমাণু মডেল (নবম-দশম)

রাদারফোর্ডের পরমাণু মডেল: নিউক্লিয়াসের আবিষ্কার ও পারমাণবিক বিজ্ঞানের নতুন দিগন্ত

পারমাণবিক বিজ্ঞানের ইতিহাসে আর্নেস্ট রাদারফোর্ডের পরমাণু মডেল একটি বিপ্লবী মাইলফলক। ১৯১১ সালে প্রস্তাবিত এই মডেলটি পরমাণুর গঠন সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে আমূল পরিবর্তন করে দেয়। জন ডাল্টনের অবিভাজ্য পরমাণু এবং জে.জে. থমসনের 'প্লাম পুডিং' মডেলের সীমাবদ্ধতা দূর করে, রাদারফোর্ডই প্রথম পরমাণুর কেন্দ্রে একটি ক্ষুদ্র, ঘন এবং ধনাত্মক চার্জযুক্ত নিউক্লিয়াসের অস্তিত্ব প্রমাণ করেন, যা পারমাণবিক পদার্থবিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করেছিল।


আলফা কণা বিক্ষেপণ পরীক্ষা: এক যুগান্তকারী পর্যবেক্ষণ

রাদারফোর্ডের মডেলটি তাঁর বিখ্যাত "আলফা কণা বিক্ষেপণ পরীক্ষা" (Alpha Particle Scattering Experiment) বা "সোনালি পাতের পরীক্ষা" (Gold Foil Experiment) থেকে প্রাপ্ত সিদ্ধান্তের উপর ভিত্তি করে তৈরি। তিনি এবং তাঁর সহকর্মী হ্যান্স গেইগার ও আর্নেস্ট মার্সডেন এই পরীক্ষাটি সম্পন্ন করেন।

পরীক্ষার পদ্ধতি

  1. উৎসের ব্যবহার: একটি তেজস্ক্রিয় উৎস (যেমন রেডিয়াম) থেকে উচ্চ গতিসম্পন্ন ধনাত্মক চার্জযুক্ত আলফা কণা (হিলিয়াম আয়ন, He2+) নির্গত করা হয়।
  2. সোনালি পাতের ব্যবহার: এই আলফা কণার স্রোতকে একটি অত্যন্ত পাতলা সোনার পাতের (প্রায় ১০০ ন্যানোমিটার পুরু) ওপর নিক্ষেপ করা হয়।
  3. পর্যবেক্ষণ: সোনার পাতকে অতিক্রম করার পর আলফা কণাগুলোর গতিপথ নির্ভুলভাবে শনাক্ত করার জন্য পাতের চারপাশে একটি বৃত্তাকার জিঙ্ক সালফাইড (ZnS) পর্দা রাখা হয়। আলফা কণা এই পর্দায় আঘাত করলে আলোক বিচ্ছুরণ (Scintillation) ঘটে, যা থেকে কণার অবস্থান বোঝা যায়।
রাদারফোর্ডের পরমাণু মডেল

পর্যবেক্ষণ ও সিদ্ধান্ত

এই পরীক্ষা থেকে তিনটি আশ্চর্যজনক পর্যবেক্ষণ পাওয়া যায়, যা তৎকালীন 'প্লাম পুডিং' মডেলকে ভুল প্রমাণ করে:

পর্যবেক্ষণ ব্যাখ্যা ও সিদ্ধান্ত
১. প্রায় ৯৯.৯% আলফা কণা সোজাসুজি চলে যায়: পরমাণুর বেশিরভাগ স্থানই ফাঁকা। যদি থমসনের মডেল সঠিক হতো, তবে আলফা কণাগুলো ধনাত্মক ও ঋণাত্মক চার্জের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় সামান্য হলেও দিক পরিবর্তন করত।
২. অল্প কিছু কণা সামান্য কোণে বেঁকে যায়: আলফা কণাগুলো ধনাত্মক চার্জযুক্ত হওয়ায়, সেগুলো যখন পরমাণুর কেন্দ্রের কাছাকাছি আসে, তখন একটি শক্তিশালী বিকর্ষণ বল অনুভব করে। এর থেকেই বোঝা যায় পরমাণুর কেন্দ্রে একটি ধনাত্মক চার্জযুক্ত অঞ্চল আছে।
৩. প্রায় ২০,০০০ কণার মধ্যে একটি কণা ৯০° বা তার বেশি কোণে বিচ্যুত হয় (এমনকি কিছু প্রায় ১৮০° কোণে ফিরে আসে): এই পর্যবেক্ষণটি ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এটি প্রমাণ করে যে পরমাণুর প্রায় সমস্ত ভর এবং ধনাত্মক চার্জ একটি অত্যন্ত ক্ষুদ্র ও ঘন জায়গায় কেন্দ্রীভূত। রাদারফোর্ড এই কেন্দ্রীয় অংশের নাম দেন নিউক্লিয়াস

রাদারফোর্ডের পরমাণু মডেলের মূল ভিত্তি

উপরোক্ত পরীক্ষা থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে রাদারফোর্ড তাঁর সৌরজগতের মডেল (Planetary Model) প্রস্তাব করেন।

  1. নিউক্লিয়াসের অস্তিত্ব: পরমাণুর কেন্দ্রে একটি অত্যন্ত ক্ষুদ্র (ব্যাসার্ধ প্রায় 10-15 মিটার), অতি ঘন এবং ধনাত্মক চার্জযুক্ত বস্তু রয়েছে, যাকে নিউক্লিয়াস বলে। পরমাণুর প্রায় সমস্ত ভর (প্রায় ৯৯.৯%) এই নিউক্লিয়াসেই থাকে।
  2. ইলেকট্রনের ঘূর্ণন: পরমাণুর ঋণাত্মক চার্জযুক্ত ইলেকট্রনগুলো নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে সৌরজগতের গ্রহগুলোর মতো অবিরাম বৃত্তাকার পথে ঘুরতে থাকে।
  3. ফাঁকা স্থান: নিউক্লিয়াসের আকার পরমাণুর আকারের (ব্যাসার্ধ প্রায় 10-10 মিটার) তুলনায় নগণ্য হওয়ায় পরমাণুর বেশিরভাগ অংশই ফাঁকা।
  4. স্থিরতা: নিউক্লিয়াসের ধনাত্মক চার্জ এবং ইলেকট্রনের ঋণাত্মক চার্জের মধ্যে একটি স্থির তড়িৎ আকর্ষণ বল (কুলম্ব বল) কাজ করে। এই আকর্ষণ বল ইলেকট্রনগুলোকে ঘোরার জন্য প্রয়োজনীয় কেন্দ্রমুখী বল (Centripetal Force) সরবরাহ করে, যা পরমাণুকে স্থিতিশীল রাখে।
রাদারফোর্ডের পরমাণু মডেল

মডেলের সীমাবদ্ধতা ও ত্রুটি

রাদারফোর্ডের মডেল যুগান্তকারী হলেও এটি কিছু মৌলিক প্রশ্নের উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়, যা ক্লাসিক্যাল পদার্থবিজ্ঞানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল।

  1. পরমাণুর স্থায়িত্ব ব্যাখ্যায় ব্যর্থতা: ম্যাক্সওয়েলের তড়িৎ-চৌম্বকীয় তত্ত্ব অনুসারে, কোনো চার্জযুক্ত কণা (যেমন ইলেকট্রন) ত্বরণ সহকারে ঘুরতে থাকলে তা ক্রমাগত শক্তি বিকিরণ করবে। এর ফলে, ইলেকট্রনের শক্তি কমতে থাকবে এবং সেটি সর্পিল পথে নিউক্লিয়াসের দিকে অগ্রসর হয়ে অবশেষে নিউক্লিয়াসে পতিত হবে। তত্ত্ব অনুযায়ী, এতে পরমাণুর অস্তিত্ব বিলুপ্ত হতে মাত্র 10-8 সেকেন্ড সময় লাগার কথা। কিন্তু বাস্তবে পরমাণু অত্যন্ত স্থিতিশীল। রাদারফোর্ড এর কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
  2. পারমাণবিক বর্ণালী ব্যাখ্যায় ব্যর্থতা: রাদারফোর্ডের মডেল অনুসারে, ইলেকট্রন ক্রমাগত শক্তি বিকিরণ করায় পরমাণু থেকে নিরবচ্ছিন্ন বর্ণালী (Continuous Spectrum) পাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে, উত্তেজিত পরমাণু শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কের আলো বিকিরণ করে, যা বিচ্ছিন্ন বা রেখা বর্ণালী (Line Spectrum) তৈরি করে। এই মডেল রেখা বর্ণালীর উদ্ভবের কারণ ব্যাখ্যা করতে পারেনি।
  3. ইলেকট্রনের বিন্যাস: এই মডেলে নিউক্লিয়াসের চারপাশে ইলেকট্রনগুলোর কক্ষপথের আকার, আকৃতি বা শক্তিস্তর সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট ধারণা দেওয়া হয়নি।

গুরুত্ব ও উত্তরাধিকার

ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও, রাদারফোর্ডের মডেল পরমাণুর গঠন বোঝার ক্ষেত্রে একটি অপরিহার্য ধাপ ছিল। এই মডেলের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো নিউক্লিয়াসের আবিষ্কার, যা পারমাণবিক গবেষণার দরজা খুলে দেয়। এই মডেলের সীমাবদ্ধতাগুলোই পরবর্তীকালে নিলস বোরকে কোয়ান্টাম তত্ত্বের ধারণা ব্যবহার করে তাঁর বিখ্যাত বোর মডেল প্রস্তাব করতে অনুপ্রাণিত করে। এভাবেই রাদারফোর্ডের কাজ ক্লাসিক্যাল পদার্থবিজ্ঞান থেকে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের জগতে উত্তরণের পথ তৈরি করে দেয়।