ড্রাই সেল (Dry Cell) নবম-দশম শ্রেণী
ড্রাই সেল (Dry Cell)
ড্রাই সেল, যা লেকল্যান্শ কোষ (Leclanché cell) নামেও পরিচিত, হলো এক প্রকার ইলেকট্রোকেমিক্যাল সেল (electrochemical cell) যা তরল ইলেক্ট্রোলাইটের পরিবর্তে একটি পেস্ট (paste) ইলেক্ট্রোলাইট ব্যবহার করে। এটি একটি প্রাথমিক কোষ (primary cell), যার অর্থ হলো এটি একবার ব্যবহারযোগ্য এবং পুনরায় চার্জ করা যায় না। এই ধরনের কোষগুলি সাধারণত পোর্টেবল ইলেকট্রনিক ডিভাইসে শক্তির উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয় কারণ এগুলি হালকা, বহনযোগ্য এবং সহজে ফুটো হয় না।
ড্রাই সেল এর সংজ্ঞা
একটি ড্রাই সেল হলো এক প্রকার প্রাথমিক ভোল্টাইক কোষ (primary voltaic cell) যেখানে ইলেক্ট্রোলাইট একটি ভেজা পেস্ট আকারে থাকে এবং কোনো মুক্ত তরল থাকে না। এটি রাসায়নিক শক্তিকে সরাসরি বৈদ্যুতিক শক্তিতে রূপান্তরিত করে।
ড্রাই সেলের গঠন (Construction of Dry Cell)
একটি সাধারণ ড্রাই সেল নিম্নলিখিত প্রধান উপাদানগুলি নিয়ে গঠিত:
- অ্যানোড (Anode): এটি জিঙ্ক (Zn) বা দস্তা দিয়ে তৈরি একটি চোঙা বা পাত্র, যা কোষের বাইরের আবরণ হিসেবে কাজ করে। জিঙ্ক অ্যানোড হিসেবে কাজ করে এবং জারণ (oxidation) প্রক্রিয়ায় ইলেকট্রন ত্যাগ করে। এটি ড্রাই সেলের ঋণাত্মক টার্মিনাল (-ve terminal)।
- ক্যাথোড (Cathode): এটি একটি কার্বন দণ্ড (গ্রাফাইট) যা কোষের কেন্দ্রে অবস্থিত। কার্বন দণ্ডটি নিজে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অংশ নেয় না, তবে এটি ইলেকট্রন গ্রহণকারী হিসেবে কাজ করে। এর চারপাশে ম্যাঙ্গানিজ ডাই অক্সাইড (MnO2) এবং কার্বনের গুঁড়োর একটি মিশ্রণ থাকে। এটি ড্রাই সেলের ধনাত্মক টার্মিনাল (+ve terminal)।
- ইলেকট্রোলাইট (Electrolyte): কার্বন দণ্ড এবং ম্যাঙ্গানিজ ডাই অক্সাইডের মিশ্রণের চারপাশে অ্যামোনিয়াম ক্লোরাইড (NH4Cl), জিঙ্ক ক্লোরাইড (ZnCl2) এবং জলের একটি আর্দ্র পেস্ট থাকে। এর সাথে সামান্য পরিমাণে কার্বনের গুঁড়োও মেশানো হয় যা পেস্টের পরিবাহিতা বাড়ায়। এই পেস্টটি আর্দ্র ইলেক্ট্রোলাইট হিসেবে কাজ করে।
- সেপারেটর (Separator): জিঙ্ক অ্যানোড এবং ইলেক্ট্রোলাইট পেস্টের মধ্যে একটি ছিদ্রযুক্ত কাগজের স্তর বা অন্য কোনো পদার্থ থাকে যা উভয়কে পৃথক রাখে এবং শর্ট সার্কিট প্রতিরোধ করে।
- সিল (Seal): কোষের উপরের অংশ একটি বিটুমিন বা প্লাস্টিকের সিল দ্বারা বন্ধ করা থাকে যাতে ইলেক্ট্রোলাইট শুকিয়ে না যায় এবং বাইরের বাতাস বা আর্দ্রতা ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে।
- মেটাল ক্যাপ (Metal Cap): কার্বন দণ্ডের উপরে একটি ধাতব টুপি থাকে যা ধনাত্মক টার্মিনাল (+ve terminal) হিসেবে কাজ করে।
ড্রাই সেলের কার্যপ্রণালী (Working Principle of Dry Cell)
যখন একটি ড্রাই সেলকে একটি বৈদ্যুতিক সার্কিটের সাথে সংযুক্ত করা হয়, তখন রাসায়নিক বিক্রিয়া শুরু হয় এবং ইলেকট্রন প্রবাহের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়।
১. অ্যানোড বিক্রিয়া (Oxidation at Anode):
জিঙ্ক অ্যানোড ইলেকট্রন হারায় এবং জিঙ্ক আয়ন হিসাবে ইলেক্ট্রোলাইটে দ্রবীভূত হয়। এটি একটি জারণ (oxidation) প্রক্রিয়া:
২. ক্যাথোড বিক্রিয়া (Reduction at Cathode):
কার্বন দণ্ডের চারপাশে থাকা ম্যাঙ্গানিজ ডাই অক্সাইড (MnO2) এবং অ্যামোনিয়াম আয়ন (NH4+) জিঙ্ক দ্বারা উৎপন্ন ইলেকট্রনগুলি গ্রহণ করে। এটি একটি বিজারণ (reduction) প্রক্রিয়া:
৩. পার্শ্ব-বিক্রিয়া (Side Reaction):
ক্যাথোডে উৎপন্ন অ্যামোনিয়া (NH3) গ্যাস আকারে জমতে শুরু করলে ব্যাটারির কার্যকারিতা কমে যেতে পারে (যা পোলারাইজেশন নামে পরিচিত)। এই পোলারাইজেশন প্রতিরোধ করার জন্য, উৎপন্ন অ্যামোনিয়া জিঙ্ক আয়নের (Zn2+) সাথে বিক্রিয়া করে একটি জটিল যৌগ গঠন করে:
৪. সামগ্রিক বিক্রিয়া (Overall Reaction):
ড্রাই সেলের সামগ্রিক রাসায়নিক বিক্রিয়াটি নিম্নরূপ:
এই রাসায়নিক বিক্রিয়াগুলির ফলস্বরূপ, ইলেকট্রন অ্যানোড থেকে ক্যাথোডের দিকে বাহ্যিক সার্কিটের মাধ্যমে প্রবাহিত হয়, যা বৈদ্যুতিক প্রবাহ সৃষ্টি করে। একটি সাধারণ ড্রাই সেলের ভোল্টেজ প্রায় ১.৫ ভোল্ট (1.5 V) হয়।
ড্রাই সেলের সুবিধা ও অসুবিধা
| সুবিধা (Advantages) | অসুবিধা (Disadvantages) |
|---|---|
| ১. পোর্টেবল ও বহনযোগ্য: ড্রাই সেল ওজনে হালকা এবং সহজে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নেওয়া যায়। | ১. সীমিত শেল্ফ লাইফ: দীর্ঘ সময় ব্যবহার না করলে বা সংরক্ষণে রাখলে রাসায়নিক বিক্রিয়া চলতে থাকে এবং এর কার্যক্ষমতা হ্রাস পায়। |
| ২. কম ব্যয়বহুল: অন্যান্য ব্যাটারির তুলনায় উৎপাদন খরচ তুলনামূলকভাবে কম, তাই সহজে বাজারে পাওয়া যায়। | ২. পুনরায় চার্জ করা যায় না: এটি একটি প্রাথমিক কোষ, তাই এর রাসায়নিক বিক্রিয়া একমুখী এবং এটি রিচার্জ করা যায় না। একবার চার্জ শেষ হলে এটি অব্যবহারযোগ্য হয়ে পড়ে। |
| ৩. ব্যবহার সহজ: সহজে ব্যবহার করা যায় এবং এর পেস্ট ইলেক্ট্রোলাইটের কারণে তরল ফুটো হওয়ার ঝুঁকি কম থাকে। | ৩. ভোল্টেজ দ্রুত কমে যায়: ব্যবহারের সময় দ্রুত ভোল্টেজ হ্রাস পায়, যার ফলে যন্ত্রপাতির কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে। |
| ৪. নিরাপদ: তরল ইলেক্ট্রোলাইট না থাকায় ফুটো হওয়ার সম্ভাবনা কম, যা বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম এবং ব্যবহারকারীর জন্য তুলনামূলকভাবে নিরাপদ। | ৪. পরিবেশগত প্রভাব: নিষ্পত্তি করার সময় জিঙ্ক, ম্যাঙ্গানিজ এবং অন্যান্য ভারী ধাতুর কারণে পরিবেশ দূষণের ঝুঁকি থাকে। |
ড্রাই সেলের প্রধান সুবিধা এবং অসুবিধাগুলির একটি তুলনা।
ড্রাই সেলের ব্যবহার (Uses of Dry Cell)
ড্রাই সেল বিভিন্ন দৈনন্দিন ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় কারণ এগুলি সহজে ব্যবহারযোগ্য এবং পোর্টেবল। এর মধ্যে কয়েকটি প্রধান ব্যবহার হলো:
- ফ্ল্যাশলাইট (Flashlights)
- রিমোট কন্ট্রোল (Remote controls)
- খেলনা (Toys)
- পোর্টেবল রেডিও (Portable radios)
- প্রাচীর ঘড়ি (Wall clocks)
- ক্যালকুলেটর (Calculators)
- কিছু কিছু ক্যামেরা এবং অন্যান্য ছোট ইলেকট্রনিক গ্যাজেট।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আমাদের নিবন্ধগুলিতে মন্তব্য করার সময় দয়া করে শ্রদ্ধাশীল এবং গঠনমূলক হন। অনুপযুক্ত, আপত্তিকর, বা অফ-টপিক মন্তব্য মুছে ফেলা হবে। আসুন ABC আইডিয়াল স্কুলের সকল পাঠকদের জন্য একটি ইতিবাচক এবং শিক্ষামূলক পরিবেশ বজায় রাখি। আপনার সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ!