আমার প্রিয় লেখক রচনা

আমার প্রিয় লেখক

এছাড়াও আরো যে বিষয় সম্পর্কে লিখতে পারবে:
👉তোমার প্রিয় ব্যক্তিত্ব
👉তোমার প্রিয় কবি
👉তোমার প্রিয় সাহিত্যিক
👉তোমার প্রিয় লেখক
আমার প্রিয় লেখক রচনা

ভূমিকা :

আমার নিজের ভালাে ও মন্দ লাগার বিচারে কাজী নজরুল ইসলামই আমার প্রিয় লেখক , আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব । সাহিত্যের বিভিন্ন অঙ্গনে তিনি অবাধে বিচরণ করলেও মূলত কবি , বিশেষত বিদ্রোহী কবি হিসেবেই তিনি আমাদের কাছে এবং বিদেশেও পরিচিত । কাজী নজরুল ইসলামের লেখনীতে আমি আমার চিন্তা - চেতনার প্রকাশ পাই , তাঁর ব্যক্তিত্বে খুঁজে পাই উদার - অসাম্প্রদায়িক চেতনার আদর্শ।

নজরুলকে কেন ভালােবাসি :

রবীন্দ্রপ্রতিভার জয়গানে বাংলা সাহিত্য যখন মুখরিত , ঠিক তখনই সম্পূর্ণ এক নতুন অথচ কালজয়ী প্রতিভা নিয়ে বাংলা সাহিত্যের প্রাঙ্গণে আবির্ভূত হন কাজী নজরুল ইসলাম । রচনার বলিষ্ঠতা , প্রকাশভঙ্গির সরলতা , উদাত্ত কণ্ঠের মাধুর্য এবং সর্বোপরি সাধারণ মানুষের প্রতি গভীর মমতা সব মিলিয়ে কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন বাংলা সাহিত্যের এক অসাধারণ প্রতিভা ।

জন্ম ও সৈনিক জীবন :

১৩০৬ সালের ১১ জ্যৈষ্ঠ ( ১৮৯৯ সালের ২৫ মে ) কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে । মাত্র আট বছর বয়সে পিতৃহীন হয়ে তার অসহায় জীবন শুরু হয় । এগারাে বছর বয়সে সাহিত্যাঙ্গনে তাঁর প্রথম ভীরু পদচারণা । প্রথম মহাযুদ্ধের দামামা বেজে উঠলে বিদ্রোহী কবির রক্ত নেচে ওঠে । দশম শ্রেণির ছাত্র নজরুল যােগ দেন বাঙালি পল্টনে । যুদ্ধের দামামার মধ্যেও তাঁর সাহিত্যচর্চা থেমে থাকে নি । তখন থেকেই অন্যায় - অবিচারের বিরুদ্ধে এক নতুন যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকেন তিনি ।

বিদ্রোহের কবি :

যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্রোহী ’ কবিতা নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেন । বস্তুত ' বিদ্রোহী ' কবিতা দিয়েই কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রপ্রভাবকে অতিক্রম করে এক নতুন যুগের সূচনা করেন । তিনি উচ্চারণ করলেন-

“ মহা বিদ্রোহী রণক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন রােল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না ।
অত্যাচারীর খড়গকৃপাণ ভীম রণভূমে রণিবে না । ”

কাজী নজরুল ইসলামের রচনার যে বিষয়টি আমার হৃদয়কে আকৃষ্ট করেছিল তা ছিল সাধারণ মানুষের জন্যে মমতা ও দায়িত্ববােধ । সাহিত্য - সংস্কৃতিকে তিনি পরাধীন ভারতবর্ষের নির্যাতিত গণমানুষের বৈপ্লবিক চেতনার সাথে সম্পৃক্ত করেছিলেন । “ Arts for arts ” কাজী নজরুল ইসলাম এটি বিশ্বাস করতেন না । তিনি বিশ্বাস করতেন , একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে , একজন সংস্কৃতিকর্মী হিসেবে সমাজ ও মানুষের প্রতি তাঁর বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে । এ কারণে অন্যান্যদের মতাে তিনি নিরাপদ দূরত্বে থেকে সাহিত্য রচনা করেন নি । ব্রিটিশরাজের বিরুদ্ধে আন্দোলনে তিনি রাজনৈতিক নেতার মতােই প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিয়েছেন , জেল খেটেছেন । জেলে বসেই তিনি বিদ্রোহের বাণী ছড়িয়েছেন উদ্ধত কণ্ঠে-

“ কারার ঐ লৌহ কপাট
ভেঙে ফেল , কর যে লােপাট
রক্ত জমাট শিকলপূজার পাষাণ বেদী ।"

মানবতার কবি :

অগ্নিবীণা , বিষের বাঁশী , সর্বহারা , ভাঙার গান প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থে নজরুল সাম্রাজ্যবাদ ও অন্যায় - অবিচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘােষণা করেছেন । সমাজের শােষক ও প্রবক শ্রেণিকে তিনি মানবতার শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেছেন । সাধারণ মানুষের প্রতি অসীম দরদ তাকে একজন অকৃত্রিম মানবপ্রেমী হিসেবে পরিচিত করেছে । তাই ঔপনিবেশিক শোষকগােষ্ঠী ও তাদের দোসরদের বিরুদ্ধে নজরুল নিদারুণ ব্যথায় অভিশাপ দিয়ে বলেছেন-

“ প্রার্থনা করাে , যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস ,
যেন লেখা হয় আমার লেখায় তাদের সর্বনাশ ।"

সাম্যের কবি:

নজরুলের সাম্যবাদী ধ্যান - ধারণাও আমাকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করে । তিনি বিশ্বাস করতেন , মানুষের মধ্যে আতরাফ-আশরাফ বলে কিছু নেই । রাজক্ষমতা হারিয়ে ভারতের মুসলমানেরা যখন হতাশ ও দিশেহারা তখন তার ইসলামি ভাবাবেগসমৃদ্ধ কবিতা গান - গজল তাদের বিশেষভাবে উজ্জীবিত করেছিল । ইসলামি গানের পাশাপাশি তিনি প্রচুর শ্যামা সংগীতও রচনা করেছিলেন । প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন একজন নির্ভেজাল অসাম্প্রদায়িক মানুষ । তিনি হিন্দু - মুসলমানের ওপর স্থান দিয়েছিলেন মানবতাকে । তাই জাতীয় নেতৃত্বের প্রতি হিন্দু - মুসলমান নির্বিশেষে সকল মানুষকে রক্ষার আবেদন জানালেন-

“ হিন্দু না ওরা মুসলিম ? ওই জিজ্ঞাসে কোনাে জন ?
কান্ডারী , বল , ডুবিছে মানুষ , সন্তান মাের মার । ”

সবার কবি :

নজরুলের রচনা বিচিত্রগামী । ছােট্ট শিশুদের জন্যে যেমন রচনা করেছেন রসালাে ছড়া - কবিতা - গান , তেমনি বড়দের জন্যেও রচনা করেছেন অনেক গল্প - উপন্যাস । সাহিত্য সাধনার পাশাপাশি সংগীতকেও তিনি গ্রামবাংলার মানুষের কাছাকাছি নিয়ে গেছেন । তিনি প্রেম - ভালােবাসার গান যেমন গেয়েছেন , তেমনি বিদ্রোহের সুরও ছড়িয়ে দিয়েছেন বাংলার ঘরে ঘরে । হিন্দু - মুসলমান - বৌদ্ধ - খ্রিষ্টান সবার মনের মণি হয়ে উঠেছিলেন নজরুল । তার কবিতা ও গানে সবার কথাই প্রতিধ্বনিত হয়েছে । অন্নদাশঙ্কর রায় যথার্থই বলেছেন-

“ ভুল হয়ে গেছে বিলকুল
আর সব কিছু ভাগ হয়ে গেছে
ভাগ হয় নিকো নজরুল । ”

সাহিত্য বিচার :

বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ থেকে আহরিত জ্ঞান ও বাংলা ভাষার পাশাপাশি আরবি - ফারসি - হিন্দি - উর্দু - সংস্কৃত শব্দাবলি নজরুলের সাহিত্যকে এক অনন্য বৈশিষ্ট্যে ভাস্বর করেছে । শিল্প বা জনপ্রিয়তার বিচারে নজরুলের সাহিত্য কতখানি শ্রেষ্ঠ সে বিচার করবেন বিদগ্ধজনেরা । তবে আমার কাছে নজরুল সবচেয়ে প্রিয় লেখক , কবি ও সাহিত্যিক ।

উপসংহার:

নজরুলের আদর্শ ও যৌবনধর্ম আজ আমাদের চলার পথের পাথেয় । তাঁর সাম্যচেতনা এবং মানবপ্রেম আজকের হানাহানিপ্রবণ পৃথিবীতে বড়ই প্রয়ােজন । তাই নজরুল সাহিত্যের শিল্পমূল্যের চেয়ে সামাজিক মূল্যও কম নয় । নজরুল চিরদিন প্রেম ও পুণ্যে , উদারতা ও সাম্যে , বিদ্রোহ ও বজ্রে , মরমী চেতনায় ও আধ্যাত্মিকতায় এক অবিস্মরণীয় নাম হিসেবে বিশ্বসাহিত্যে টিকে থাকবেন।


আরো পড়ুন:
পরবর্তী পোস্ট পূর্ববর্তী পোস্ট
No Comment
আপনার মন্তব্য জানান
comment url