অনুবাদ কাকে বলে ও অনুবাদ জানা কেন প্রয়োজন | বাংলা ব্যাকরণ

অনুবাদ

বিদেশী বিভিন্ন ভাষা হতে বাংলায় অনুবাদ করা যায় এবং বাংলা থেকেও অন্য ভাষায় অনুবাদ করা সম্ভব। তাই এক কথায় অনুবাদ হল ভাষান্তর। এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় নিয়ে যাওয়া। কিন্তু এই নিয়ে যাওয়াটি সবক্ষেত্রে সহজ নয়। কোনো বিষয়কে রূপান্তরিত করতে হলে উভয় ভাষায় গঠন কৌশল, রীতি প্রভৃতি সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞান থাকা প্রয়োজন।

প্রত্যেক ভাষারই নিজস্ব গঠনভঙ্গি, প্রকাশরীতি ও বৈশিষ্ট্য আছে। অনুবাদে সে বৈশিষ্ট্যের যথাযথ প্রতিফলন দরকার। মোট কথা, অনুবাদে মূল সুরটি কিছুতেই বিকৃত করা যাবে না। অনুবাদ হল এক ধরনের শিল্প। অনুবাদ কর্মে যদি ভাষায় মুন্সিয়ানা আর মূলের রূপ, রস, স্বাদ ও সৌন্দর্য অক্ষুণ্ণ থাকে তবে অনায়াসে তা শিল্পকে ছুঁয়ে যেতে পারে।

অনুবাদ কাকে বলে ও অনুবাদ জানা কেন প্রয়োজন | বাংলা ব্যাকরণ ও নির্মিতি

অনুবাদ কী?

অনুবাদ বলতে বোঝায় এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় রূপান্তর । জ্ঞান - বিজ্ঞান , ভাষা - সংস্কৃতি , ব্যবসা - বাণিজ্য প্রতিটি ক্ষেত্রে বৈশ্বিক যোগাযোগ ও ভাব বিনিময়ের ক্ষেত্রে এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় পরিবর্তন অপরিহার্য । ইংরেজি আন্তর্জাতিক ভাষা হওয়ায় বিশ্বায়নের এ যুগে বিশ্বের প্রায় সকল তথ্য ও জ্ঞান ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে পাওয়া সম্ভব । সে কারণে ইংরেজি থেকে নিজ ভাষায় অনুবাদের দিকটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় গুরুত্ব পাচ্ছে । ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদে দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে উভয় ভাষায় পারদর্শী হওয়া প্রয়োজন ।

অনুবাদের প্রকারভেদ:

অনুবাদ প্রধানত দুই ধরনের । ক. আক্ষরিক অনুবাদ ও খ. ভাবানুবাদ ।কেউ কেউ আবার মূলানুগ ও স্বাধীন এই দু’ধরনের অনুবাদ পদ্ধতির কথা স্বীকার করেছেন। অনুবাদের প্রকরণ কৌশলগুলিকে মূলত তিনটি স্তরে ভাগ করা হয়ে থাকে।

  • শব্দের স্তর
  • অন্বয়ের স্তর
  • শব্দার্থের স্তর।

এছাড়া কাব্য কবিতার অনুবাদের ক্ষেত্রে একটু ভিন্নমাত্রা পায়।

  • ছন্দ বা ধ্বনিঝংকারের স্তর
  • অলংকারের স্তর।

আক্ষরিক অনুবাদ : আক্ষরিক অনুবাদে সাধারণত মূলবক্তব্যে ব্যবহৃত ভাষার বাক্যশৈলী , ভঙ্গি বা শব্দের হুবহু অনুবাদ করার চেষ্টা করা হয় । যথাসম্ভব মূলানুগ হয় বলে এ ধরনের অনুবাদ প্রায়শ কৃত্রিম ও আড়ষ্ট হয়ে থাকে । যেমন— ‘ One should love one's country ' বাক্যটির আক্ষরিক অনুবাদ হচ্ছে ' একজনের উচিত একজনের দেশকে ভালোবাসা । ' কিন্তু এর চেয়ে গ্রহণযোগ্য ও সাবলীল অনুবাদ হচ্ছে , ' প্রত্যেকেরই উচিত নিজের দেশকে ভালোবাসা । '

ভাবানুবাদ : ভাবানুবাদে মূল ভাষার ভাব ঠিক রেখে অনুবাদের ভাষার বাকরীতি অনুযায়ী স্বাধীন ও স্বচ্ছন্দ অনুবাদ করা হয়ে থাকে । এ ধরনের অনুবাদ সাবলীল ও সুখপাঠ্য হয়ে থাকে । ভাবানুবাদ করার ক্ষেত্রে স্বীয় সৃজনশীলতা ও মেধার পরিচয় দিতে হয় ।

আক্ষরিক অনুবাদ ও ভাবানুবাদের পার্থক্য

১. আক্ষরিক অনুবাদে প্রতিটি শব্দের, প্রতিটি বাক্যের হুবহু অনুবাদ করা হয়। ভাবানুবাদে মূল ভাবটি বজায় রেখে নতুন ভাবে বাক্য গঠন করা হয়।

২. আক্ষরিক অনুবাদ নিকৃষ্ট বলে গণ্য হয়। ভাবানুবাদ উৎকৃষ্ট অনুবাদ বলে গণ্য হয়।
৩. দাপ্তরিক ও আইনি কাজকর্মে আক্ষরিক অনুবাদের কিছু উপযোগিতা আছে। ভাবানুবাদের উপযোগিতা শিক্ষা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে।
৪. আক্ষরিক অনুবাদে ভাষা সাবলীল হয় না। ভাবানুবাদে ভাষা সাবলীল হয়।
৫. আক্ষরিক অনুবাদে বাক্যের সরলার্থ ছাড়া গূঢ় প্রকাশিত হয় না। ভাবানুবাদে বাক্যের গূঢ় ভাবার্থ প্রকাশ করা যায়।
৬. প্রবাদ, প্রবচন ও বিশিষ্ট বাক্যের আক্ষরিক অনুবাদ সম্ভব হয় না। ভাবানুবাদ যে কোনো বাক্যের‌ই করা যায়।

অনুবাদের কৌশল

ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদের কৌশল : ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদের সময় নিচের পদ্ধতি বা কৌশলগুলো অবলম্বন করা দরকার ।

১ . অনুবাদের ভাষাকে সহজ - সরল ও প্রাঞ্জল রাখতে হবে ।
২. অনুবাদের জন্য নির্ধারিত অংশটুকু বার বার মনোযোগ দিয়ে পড়ে অর্থ উপলব্ধির চেষ্টা করতে হবে ।
৩. অনুবাদের জন্য শব্দের আক্ষরিক অনুবাদ করা অসম্ভব বলে মনে হয় সেগুলোর ক্ষেত্রে ভাবানুবাদের আশ্রয় নিতে হবে ।
৪. ইংরেজি ভাষায় দুর্বোধ্য শব্দ ও বাক্যাংশের অর্থ জানা না থাকলে আশপাশের শব্দের ভাব থেকে কাছাকাছি অর্থ অনুধাবনের চেষ্টা করতে হবে ।
৫ . ইংরেজি ভাষায় জটিল বা যৌগিক বাক্য দীর্ঘ হলে বাংলা অনুবাদকে প্রাঞ্জল করার জন্য একাধিক বাক্যে অনুবাদ করতে হবে ।
৬ . ইংরেজি ভাষায় ব্যবহৃত প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ উক্তি অনুবাদে বহাল রাখা উচিত ।
৭. ইংরেজি ভাষায় বাচ্য ও ক্রিয়ার কাল অনুবাদে বহাল রাখা সংগত ।
৮ . ইংরেজি ভাষায় ব্যবহৃত ব্যক্তির নাম , স্থানের নাম ইত্যাদি নামবাচক বিশেষ্যের অনুবাদ হয় না । সেগুলো বাংলায় প্রতিবর্ণীকরণ করতে হয় । এ ক্ষেত্রে মূলের উচ্চারণ যথাসম্ভব মান্য করা ভালো । তবে বহুল প্রচলিত প্রতিবর্ণীকৃত রূপও ব্যবহার করা চলে । যেমন— রীতি অনুযায়ী Tolstoy- এর উচ্চারণ- তলস্তয় কিন্তু প্রচলিত বাংলা উচ্চারণ টলস্টয় ।
৯. ইংরেজি শব্দের ক্ষেত্রে বাংলায় বহুল ব্যবহৃত বা মান্য পরিভাষা ব্যবহার করা উচিত । যেমন : Science – বিজ্ঞান , Court - আদালত , Nation – জাতি তবে বাংলা পরিভাষা দুর্বোধ্য হলে প্রতিবর্ণীকরণই শ্রেয় । যেমন : Computer – কম্পিউটার , Stadium – স্টেডিয়াম
১০. বাংলা অনুবাদ বাংলা বাক্যরীতি অনুযায়ী হওয়া উচিত । ইংরেজি বাক্যশৈলীকে বাংলা বাক্যরীতিতে পরিবর্তন করে নিতে হয় । যেমন : ' There is none else like my mother . ' ইংরেজি বাক্যশৈলী অনুসরণ করলে এ বাক্যের অনুবাদ হবে , সেখানে নেই আর কেউ মতো আমার মায়ের ’ , যা গ্রহণযোগ্য নয় । গ্রহণযোগ্য অনুবাদ হবে , ' আমার মায়ের মতো আর কেউ নেই । '

অনুবাদের সমস্যা

অনুবাদকের অনুবাদচর্চায় প্রতিবন্ধকতার জায়গাগুলিকে পবিত্র সরকার নির্ণয় করেছেন।

সেগুলি হল:
  • ধ্বন্যাত্মক শব্দা
  • বলিনিরর্থিত প্রয়োগ
  • বিশিষ্ট বাগধারা
  • সংস্কৃতি-লগ্ন শব্দাবলি
  • পরিভাষা
  • শব্দঋণ
  • নৈকট্য জনিত প্রশ্রয় – পিতাজী ≠ পিতা। কথ্য বাংলায় পিতা শব্দের চল নেই।
  • সমার্থক শব্দাবলি। যেমন – যুদ্ধ, লড়াই, সংগ্রাম শব্দগুলি সমার্থক কিন্তু প্রেক্ষিত অনুযায়ী শব্দগুলির অর্থের রদবদল ঘটে।
  • ভিন্নার্থক শব্দাবলি। বিষয় প্রসঙ্গে একই উচ্চারিত এবং লিখিত শব্দের অর্থ বদলে যায়। যেমন – অঙ্ক, মাথা, কাঁচা ইত্যাদি শব্দ বিভিন্ন শব্দ-সংলগ্ন হয়ে বিভিন্ন অর্থ তৈরী করে।
  • রূপকার্থ বিন্যাস

তাছাড়া উদয়নারায়ণ সিংহ অনুবাদচর্চার পদ্ধতিকে গঠন প্রয়াসে দুটি নতুন ভাগে ভাগ করেছেন – অনুকথন ও অনুসরণ। এক্ষেত্রে ‘অনুকথন’ বলতে বুঝিয়েছেন নব-ভঙ্গি, শৈলী বা নব-বক্তব্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একই পাঠের বক্তব্যকে অন্যরকম ভাবে বলা। অন্যদিকে ‘অনুসরন’ ক্ষেত্রে বুঝিয়েছেন এক ভাষা থেকে আরেক ভাষায় ‘ভাষান্তর’ বা ‘পাঠান্তর’। অনুবাদকের স্বাধীনতা অনেকাংশে খর্বিত হয় এই ‘অনুসরণ’এ। কেননা মূল পাঠ্যের প্রাথমিকতাকে মেনে নিয়ে অনুবাদককে এগোতে হয়। এধরনের কাজ বর্তমানে যন্ত্র-অনুবাদের (কম্পিউটার) মধ্যে পাই। অধ্যাপক সিংহ অনুবাদচর্চা প্রসঙ্গে আরো ৫টি পদ্ধতিগত স্তর নির্ণয় করেছেন, যথা -

  • রূপান্তরণ,
  • অনুসরণ,
  • অনুলিখন,
  • সংক্ষেপণ,
  • শাস্ত্রীয় অনুবাদ।

সাধারণ জিজ্ঞাসা [FAQ]

অনুবাদ বলতে কী বোঝায়?

অনুবাদ হলো কোনো বক্তব্যকে এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় রূপান্তরিত করা। কোনো রচনার বক্তব্য বিষয়বস্তু পরিবর্তন না করে শুধু ভাষার পরিবর্তনকেই অনুবাদ বলা হয়।

অনুবাদ কয় প্রকার ও কী কী?

অনুবাদ দুই ভাগে ভাগকরা যায়। যেমন- ১. আক্ষরিক অনুবাদ এবং ২. ভাবানুবাদ।

আক্ষরিক অনুবাদ কাকে বলে?

মূল ভাষার প্রতিটি শব্দের প্রতিশব্দ ব্যবহার করে যে অনুবাদ করা হয় তাকে আক্ষরিক অনুবাদ বলা হয়। আক্ষরিক অনুবাদে ভাবার্থের দিকে দৃষ্টি দেয়া হয় না। "Many men many mind" এই বাক্যের অর্থ যদি করা হয় অনেক মানুষ অনেক মন -- তাহলে তাকে আক্ষরিক অনুবাদ বলা যায়।

ভাবানুবাদ কাকে বলে?

মূল ভাষার ভাব ঠিক রেখে সুবিধামত নিজের ভাষায় বক্তব্য প্রকাশ করাকে ভাবানুবাদ বলা হয়। ভাবানুবাদে মূল রচনার প্রতিটি শব্দের অনুবাদ করা হয় না। "Many men many mind" এই বাক্যের অর্থ যদি করা হয় নানা মুনির নানা মত তাহলে তাকে ভাবানুবাদ বলা যায়।

অনুবাদ তত্ত্ব কাকে বলে?

একটি ভাষা থেকে অন্য আরেকটি ভাষায় পরিকল্পনাগত রূপান্তর প্রক্রিয়া নাম "অনুবাদ"। ভাষার অনুবাদে দুটি ভাষার মধ্যে যে ভাষা থেকে অনুবাদ করা হয় তাকে "উৎস ভাষা", এবং যে ভাষায় অনুবাদ করা হচ্ছে তাকে "লক্ষ্য ভাষা" বলা হয়। অর্থাৎ উৎস ভাষা থেকে লক্ষ্য ভাষায় ভাষাগত উপাদান এবং যোগ্যতার (বিষয়, বক্তব্য, ভঙ্গি ইত্যদি) দ্বারা পাঠ নির্ণয় করার রূপান্তরের প্রক্রিয়াই ‘অনুবাদ তত্ত্ব’।

অনুবাদ শব্দটি জানা গুরুত্বপূর্ণ কেন?

অনুবাদ হলো ভাষান্তর, এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় রূপান্তর। বৈশ্বিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ভাষাগোষ্ঠীর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের প্রধান উপায় হচ্ছে অনুবাদ। পৃথিবীর বিভিন্ন জাতি বিভিন্ন ভাষায় সাহিত্য-সংস্কৃতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান ইত্যাদি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। সেসবের পরিচয় পেতে হলে ওই সব ভাষা থেকে সেগুলো নিজের ভাষায় অনুবাদ করে নিতে হয়। আর এইজন্য অনুবাদ শব্দটি জানা গুরুত্বপূর্ণ।

পরবর্তী পোস্ট পূর্ববর্তী পোস্ট
No Comment
আপনার মন্তব্য জানান
comment url